মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি ২০২৫-২৬: গর্ভবতী মায়েরা মাসে কত টাকা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন
দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন সময়ে এবং সন্তান জন্মের পর তার লালন-পালনে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকার চালু রেখেছে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত এই কর্মসূচি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া নয়। গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, মায়ের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসবপূর্ব যত্ন বাড়ানো এবং শিশুর জীবনের প্রথম বছরগুলোতে সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এই লেখায় জানব কত টাকা পাওয়া যায়, কারা আবেদন করতে পারবেন, কীভাবে অনলাইনে আবেদন করতে হয় এবং প্রতারণা থেকে বাঁচতে কী কী মনে রাখা জরুরি।
মাসে কত টাকা, কত মাস পর্যন্ত?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে (জুলাই ২০২৫) এই কর্মসূচির মাসিক ভাতার পরিমাণ ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে।
নির্বাচিত একজন উপকারভোগী সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সহায়তা পেতে পারেন। অর্থাৎ পুরো ৩৬ মাস ধরে মাসে ৮৫০ টাকা করে পেলে একজন মা মোট ৩০ হাজার ৬০০ টাকা সহায়তা পাবেন। ভাতার টাকা মায়ের নিজের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হিসাবে সরাসরি পাঠানো হয়।
বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মায়েরাই এই কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেন।
কারা ভাতা পেতে পারেন? (যোগ্যতা ও শর্ত)
আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব শর্ত প্রযোজ্যঃ
- আবেদনকারীর বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে (স্থানীয় নির্দেশনায় সর্বনিম্ন বয়সসীমায় সামান্য ভিন্নতা থাকতে পারে, তাই স্থানীয় অফিস থেকে নিশ্চিত হওয়া ভালো)।
- আবেদনকারীর নিজের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে হবে।
- প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় আবেদন করা যাবে; তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে এই কর্মসূচিতে আবেদন করা যায় না।
- আবেদনকারীকে দরিদ্র, অসচ্ছল বা প্রান্তিক আয়ের পরিবারভুক্ত হতে হবে এবং পারিবারিক মাসিক আয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
- আবেদনকারীর নিজের নামে ব্যাংক হিসাব অথবা NID-সংযুক্ত MFS হিসাব (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) থাকতে হবে।
- স্থানীয় পর্যায়ে নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে।
মনে রাখা জরুরি, শুধু গর্ভবতী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পাওয়া যায় না। স্থানীয় সরকারি নির্দেশনায় গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট সময়সীমার শর্তও থাকতে পারে। আবেদনকারীর যোগ্যতা, স্থানীয় বরাদ্দ এবং যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র বা তথ্য লাগবে?
আবেদন করতে সাধারণত নিচের তথ্য ও কাগজপত্র হাতের কাছে রাখা ভালোঃ
- নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- নিজের নামে সচল মোবাইল নম্বর
- নিজের নামে NID সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য
- সঠিক ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্য
- গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য বা মেডিকেল/গর্ভধারণ সংক্রান্ত সনদ
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও স্বাক্ষর (প্রয়োজন অনুযায়ী)
আবেদন ও যাচাইয়ের সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইতে পারে।
অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আবেদন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের নিজস্ব MIS পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে করা যায়। আবেদনকারী নিজে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন, অথবা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার কিংবা উপজেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তার সহায়তা নিতে পারেন। নিজের নাগরিকত্ব বা ভোটার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এলাকার মাধ্যমেই আবেদন করতে হয়।
ধাপে ধাপে আবেদন প্রক্রিয়া
১. অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ: সরকারি অনলাইন আবেদন পোর্টালে (মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের MIS) প্রবেশ করুন।
২. নতুন আবেদন নির্বাচন: ‘নতুন আবেদন (New Application)’ অপশন নির্বাচন করুন এবং সঠিক অর্থবছর (যেমন ২০২৫-২৬) সিলেক্ট করুন।
৩. ব্যক্তিগত তথ্য দিন: জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, নিজের সচল মোবাইল নম্বর, নাম ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
৪. অন্যান্য তথ্য পূরণ: গর্ভাবস্থা, সন্তানের তথ্য এবং পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থার তথ্য দিন।
৫. ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড: প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করুন।
৬. যাচাই ও জমা: সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ হয়েছে কি না ভালোভাবে যাচাই করে আবেদনটি সাবমিট করুন।
আবেদনের সময়সীমা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি মাসের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত অনলাইন আবেদন গ্রহণ করা হয়। তবে সময়সূচি এলাকা ও বরাদ্দভেদে ভিন্ন হতে পারে, তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সর্বশেষ সময়সূচি জেনে নেওয়া নিরাপদ।
আবেদন করলেই কি ভাতা নিশ্চিত?
না। অনলাইনে আবেদন করলেই কেউ সরাসরি ভাতাভোগী হয়ে যান না। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের MIS ব্যবস্থায় আবেদন গ্রহণের পর কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয় প্রাথমিক বাছাই, তথ্য যাচাই, ডাবল-ডিপিং যাচাই (একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা নিচ্ছেন কি না), অগ্রাধিকার নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাই এবং চূড়ান্ত বাছাই।
এসব প্রক্রিয়া শেষে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্য থেকে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়। সাধারণত প্রতি মাসে প্রতিটি এলাকার জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক উপকারভোগীর কোটা থাকে, ফলে যাচাই ও নির্বাচনে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
ভাতার টাকা কীভাবে পাবেন?
নির্বাচিত উপকারভোগীর নিজস্ব ব্যাংক হিসাব বা MFS হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি (G2P পদ্ধতিতে) ভাতার অর্থ পাঠানো হয়। তাই অন্য কারও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার না করে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত MFS বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করাই নিরাপদ। এতে টাকা নিজের হাতে আসে এবং জালিয়াতির ঝুঁকি কমে।
কোথায় আবেদন করবেন? সঠিক পোর্টাল চিনবেন যেভাবে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ বা ‘গর্ভবতী ভাতা’র নামে নানা লিংক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব লিংক সরকারি আবেদন পোর্টাল নয়।
মনে রাখতে হবে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন ভাতার MIS এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র MIS আলাদা ব্যবস্থা। তাই ফেসবুক বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া লিংকে NID কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সেটি প্রকৃত সরকারি ওয়েবসাইট কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং স্থানীয় (উপজেলা/জেলা) মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।
প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন
ভাতার আবেদন করে দেওয়ার নাম করে বা ভাতা ‘নিশ্চিত করে দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ টাকা চাইলে সতর্ক হোন। বিশেষ করে কেউ যদিঃ
- আপনার মোবাইলে আসা OTP জানতে চায়;
- আপনার NID এর ছবি বা তথ্য নিজের ফোনে রাখতে চায়;
- তার নিজের MFS হিসাবে টাকা পাঠাতে বলে;
- ভাতা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা দাবি করে
তাহলে তার সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন না করাই নিরাপদ। সরকারি এই কর্মসূচিতে আবেদন করতে কোনো অর্থ লাগে না, আর ভাতা ‘টাকার বিনিময়ে নিশ্চিত করা’র কোনো সুযোগও নেই।
শেষ কথা
‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ দরিদ্র গর্ভবতী মা ও তাঁর শিশুর সুস্থ সূচনার জন্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে যা এর ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব বোঝায়।
আপনি যদি যোগ্য হন, তবে সঠিক তথ্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি পোর্টালে আবেদন করুন এবং যেকোনো বিভ্রান্তিতে সরাসরি নিজের এলাকার উপজেলা/জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। আবেদন-সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনা ও সময়সূচির জন্য অফিসিয়াল সূত্রকেই বিশ্বাস করুন।
বি.দ্র.: ভাতার পরিমাণ, বয়সসীমা, আয়ের সীমা ও আবেদনের সময়সূচি সরকারি সিদ্ধান্তে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। আবেদনের আগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অথবা স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নিন।