সম্মানী ভাতার আওতায় আসছেন আরও আড়াই লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিত
দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় কর্মরত ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য নতুন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে সরকারি মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন আরও ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যুক্ত একটি বড় জনগোষ্ঠী নিয়মিত আর্থিক সহায়তার আওতায় আসবেন।
এই লেখায় আপনি জানতে পারবেন কারা এই সম্মানী পাবেন, কোন পদে কত টাকা করে দেওয়া হবে, কীভাবে টাকা পৌঁছাবে এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী।
সিদ্ধান্তটি কোথায় নেওয়া হলো
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করতে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। সেই সেলের সপ্তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এই সভা। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ও সেলের সভাপতি মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
চলতি অর্থবছরে কারা কারা পাবেন
সভায় জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন উপকারভোগীকে এই সম্মানী দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানভেদে বণ্টন হবে এভাবেঃ
| ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান | প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা | উপকারভোগীর সংখ্যা |
|---|---|---|
| মসজিদ | ৮২,৬৫৬টি | ২,৪৭,৯৬৮ জন |
| মন্দির | ৩,০০০টি | ৬,০০০ জন |
| বৌদ্ধ বিহার | ৭৫২টি | ১,৫০৪ জন |
| গির্জা | ৩০১টি | ৬০২ জন |
| মোট | — | ২,৫৬,০৭৪ জন |
অর্থাৎ শুধু মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরাও এই কল্যাণ কর্মসূচির আওতায় আসছেন।
কোন পদে কত টাকা সম্মানী
সম্মানীর হার নির্ধারণ করা হয়েছে পদভেদে। মাসিক ভিত্তিতে যে যা পাবেনঃ
- ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যক্ষ ও যাজক: ৫,০০০ টাকা
- মুয়াজ্জিন, সেবাইত, বিহার উপাধ্যক্ষ ও সহকারী যাজক: ৩,০০০ টাকা
- মসজিদের খাদেম: ২,০০০ টাকা
এর পাশাপাশি প্রত্যেকে বছরে ২,০০০ টাকা করে উৎসব ভাতা পাবেন।
টাকা পৌঁছাবে যেভাবে
উপকারভোগীর চাহিদা অনুযায়ী দুটি উপায়ে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবেঃ
- মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে, অথবা
- সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
অর্থাৎ সরাসরি উপকারভোগীর হাতে অর্থ পৌঁছায়, ফলে মাঝখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ কম থাকে। সম্মানী বিতরণের চূড়ান্ত পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
সতর্কতা: সম্মানী ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে কেউ যেন টাকা দাবি করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। সরকারি এই সম্মানী পেতে আগাম কোনো টাকা দিতে হয় না। কোনো আর্থিক লেনদেনের অনুরোধ পেলে সাবধান থাকুন।
বাজেটে কত টাকা বরাদ্দ
সভায় উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ জানান, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গত অর্থবছরে কতজন পেয়েছেন
এই কর্মসূচি একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৬ হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে সম্মানী দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়িয়ে আড়াই লাখের বেশি করা হচ্ছে।
সামনের পরিকল্পনা: চার বছরে শতভাগ
সরকারের লক্ষ্য শুধু কিছু প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকা নয়। উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই সম্মানী কর্মসূচির আওতায় চলে আসবে। অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মসজিদ, মন্দির, বিহার ও গির্জার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধাপে ধাপে এই সুবিধা পেতে থাকবেন।
কীভাবে যোগ্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নির্বাচন করা হয়
এই সম্মানী কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাই প্রথম ধাপেই সব প্রতিষ্ঠান আওতায় আসছে না। কোন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হবেন, তা ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
তাই আপনার এলাকার মসজিদ, মন্দির, বিহার বা গির্জা এই তালিকায় আছে কি না তা নিশ্চিত হতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। অনলাইনে ছড়ানো অযাচাই তথ্যের ওপর ভরসা না করে সরকারি দপ্তরে সরাসরি যাচাই করে নিন।
এক নজরে মূল তথ্য
- চলতি অর্থবছরে নতুন উপকারভোগী: ২,৫৬,০৭৪ জন
- সিদ্ধান্ত: ধর্মীয় সম্মানী সেলের সপ্তম সভায় (৪ আগস্ট)
- বাজেট বরাদ্দ: ১,১০০ কোটি টাকা (২০২৬-২৭)
- মাসিক সম্মানী: ইমাম/পুরোহিত/যাজক ৫,০০০, মুয়াজ্জিন/সেবাইত ৩,০০০, খাদেম ২,০০০ টাকা
- উৎসব ভাতা: বছরে ২,০০০ টাকা
- অর্থ প্রদান: মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
- ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: চার বছরে শতভাগ প্রতিষ্ঠান আওতাভুক্ত
শেষ কথা
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন, অথচ তাঁদের অনেকের জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তার কাঠামো ছিল না। মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা চালু হওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে একটি নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তা যুক্ত হবে। সব ধর্মের উপাসনালয়কে একই কর্মসূচির আওতায় আনার সিদ্ধান্তটিও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিক থেকে ইতিবাচক।
আপনার এলাকার কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত কেউ এই সম্মানীর যোগ্য হয়ে থাকলে এই তথ্য তাদের সঙ্গে শেয়ার করুন, যেন কেউ সঠিক তথ্যের অভাবে সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।