রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতার আওতায় আসছে আরও ৮৬,৭০৯ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, উপকৃত হবেন প্রায় আড়াই লাখ ধর্মীয় নেতা
লিখেছেন: সামির চন্দ্র · প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ · সর্বশেষ আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬
চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতার আওতায় নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত প্রায় দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত ও যাজক মাসিক সম্মানির আওতায় আসবেন। মসজিদ থেকে শুরু করে মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জা চার ধর্মের উপাসনালয়ই এই তালিকায় রয়েছে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার (১০ আগস্ট) এই তথ্য জানানো হয়। এই লেখায় কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় আসছে, কে কত টাকা পাবেন, প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কীভাবে হয় এবং ভবিষ্যতে পরিকল্পনা কী সব কিছু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় আসছে
নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সব ধর্মের উপাসনালয়।
| ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান | সংখ্যা |
|---|---|
| মসজিদ | ৮২,৬৫৬টি |
| মন্দির | ৩,০০০টি |
| বৌদ্ধ বিহার | ৭৫২টি |
| গির্জা | ৩০১টি |
| মোট | ৮৬,৭০৯টি |
অর্থাৎ এই কার্যক্রম কোনো একটি ধর্মে সীমাবদ্ধ নয় ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান, চার ধর্মের উপাসনালয়কেই এর আওতায় আনা হচ্ছে।
কে কত টাকা সম্মানি পাবেন
সম্মানির পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে কোন দায়িত্বে আছেন তার ওপর। ভাতার কাঠামোটি নিচে এক নজরে দেওয়া হলো:
| পদ / দায়িত্ব | মাসিক সম্মানি |
|---|---|
| মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ, গির্জার যাজক | ৫,০০০ টাকা |
| মসজিদের মুয়াজ্জিন, মন্দিরের সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ, গির্জার সহকারী যাজক | ৩,০০০ টাকা |
| মসজিদের খাদেম | ২,০০০ টাকা |
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্মানির অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে ইএফটি (EFT) এর মাধ্যমে পাঠানো হয়। ফলে টাকা বিতরণে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয় না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়।
প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে যেভাবে
সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট কোটা পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে নির্বাচনের নিয়ম হলো:
মসজিদের ক্ষেত্রে:
- প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ১৫টি মসজিদ।
- ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৪টি।
- ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৩টি।
- ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ২টি।
- সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৬টি করে মসজিদ।
মন্দিরের ক্ষেত্রে:
- প্রতিটি উপজেলা থেকে ৫টি মন্দির।
- ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি থেকে ২টি এবং অন্যান্য শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি থেকে ১টি মন্দির।
- অবশিষ্ট মন্দির ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নির্বাচন করা হবে।
বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার ক্ষেত্রে:
- জেলাভিত্তিক ২৫ শতাংশ হারে সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
এই কাঠামো থেকে বোঝা যায়, কার্যক্রমটি এখনো ব্যক্তিগত আবেদনভিত্তিক নয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতারা ভাতার আওতায় আসছেন। তাই যাঁরা এখনো তালিকায় নেই, তাঁদের নিজ নিজ উপাসনালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে হালনাগাদ তথ্যের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
বাজেট বরাদ্দ ও পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
ধর্মীয় নেতাদের এই মাসিক সম্মানি দেওয়ার জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থবছরে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধর্মীয় উপাসনালয় রাষ্ট্রীয় এই সুবিধার আওতায় আসছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে দেশের শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ধাপে ধাপে দেশের সব উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাই এই সম্মানির সুবিধার আওতায় আসবেন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল এই কার্যক্রম
এই উদ্যোগ একেবারে নতুন করে শুরু হচ্ছে না; এর পেছনে রয়েছে একটি পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬ হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইতসহ মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে প্রথমবারের মতো সম্মানি দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ১৪ মার্চ ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। আর নতুন করে সম্প্রসারিত এই কার্যক্রম চলতি মাসেই উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই কল্যাণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
যে সেল এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে
মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সেলের এক সভায় নতুন ৮৬ হাজার ৭০৯টি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
নতুন করে কতগুলো প্রতিষ্ঠান এই ভাতার আওতায় আসছে?
চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে আরও ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় আসছে, যার মধ্যে ৮২,৬৫৬টি মসজিদ, ৩,০০০টি মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩০১টি গির্জা রয়েছে।
একজন ইমাম বা পুরোহিত মাসে কত টাকা পাবেন?
মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও গির্জার যাজক প্রত্যেকে মাসিক ৫,০০০ টাকা করে সম্মানি পাবেন।
মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা কত পাবেন?
মুয়াজ্জিন (এবং সমমানের সেবাইত, উপাধ্যক্ষ, সহকারী যাজক) মাসে ৩,০০০ টাকা এবং মসজিদের খাদেম মাসে ২,০০০ টাকা পাবেন।
টাকা কীভাবে হাতে আসবে?
সম্মানির পুরো অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে ইএফটির মাধ্যমে পাঠানো হয়।
এই কার্যক্রমে কি ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করা যায়?
বর্তমানে এটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনভিত্তিক কার্যক্রম ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোটায় প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় নেতারা এর আওতায় আসেন। তাই হালনাগাদ তথ্যের জন্য নিজ উপাসনালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।
সব প্রতিষ্ঠান কবে নাগাদ এই সুবিধা পাবে?
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে দেশের শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।
শেষ কথা
ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতা কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয় এটি সমাজে তাঁদের অবদানের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও বটে। এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ এবং প্রায় আড়াই লাখ ধর্মীয় নেতাকে আওতায় আনার এই উদ্যোগ দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনে বাস্তব একটি পরিবর্তন আনতে পারে। আগামী তিন অর্থবছরে শতভাগ প্রতিষ্ঠানকে আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই কর্মসূচি হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক কল্যাণ উদ্যোগ।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনের তথ্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি। সংখ্যা, কোটা বা নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই সর্বশেষ তথ্যের জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ঘোষণা যাচাই করে নেওয়ার অনুরোধ করা হলো।